২০১৭ সালের ১লা জানুয়ারি, দারুল ইফতা মাহমুদিয়্যাহর মুফতি ইব্রাহিম দেসাই তাদের ওয়েবসাইট AskImam.org-এর মাধ্যমে নিম্নলিখিত ফতোয়াটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেন। লিঙ্ক:
https://www.askimam.org/public/question_detail/37487
আল্লাহর নামে, যিনি পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু।
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
শুরুতেই, আমরা নিম্নলিখিত পর্যবেক্ষণগুলো উল্লেখ করতে চাই।
উল্লিখিত বিষয়ে আমরা অসংখ্য প্রশ্নে প্লাবিত হয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের সম্মানিত দেওবন্দ, সাহারানপুর, দাবেল, নদওয়াতুল উলামা প্রমুখের মুফতিগণ তাঁদের ফতোয়ার মাধ্যমে যথাযথভাবে তাঁদের দায়িত্ব পালন করেছেন।
উপরে উল্লিখিত ফতোয়ার পরিণতি নিয়ে আমাদের স্থানীয় জনসাধারণের পক্ষ থেকেও আমরা অসংখ্য প্রশ্নে প্লাবিত হয়েছি, এবং এখন আমরা এর জবাব দিতে বাধ্য।
আমি নিজেই তাবলীগের মেহনতের ফসল এবং নিয়মিতভাবে আমার ফতোয়ার মাধ্যমে তাবলীগের বিভিন্ন দিক সমর্থন করে ও এ নিয়ে মন্তব্য করে আসছি। সেই কারণে, এই মহান কাজে যে কোনো বিচ্যুতি অত্যন্ত বেদনার কারণ।
দেখুন: তাবলীগ জামাত বিভক্ত হওয়ার ৩ কারণ এবং এটি যেভাবে পুনঃগঠন করা হলো
আমাদের জানানো হয়েছে যে, এই বিষয়ে মতবিরোধ ও অনুচিত আচরণ ঘটছে। জনসাধারণের সাথে সম্পর্কিত তথ্য গোপন থাকতে পারে না। যথাযথ মনোযোগ না দেওয়া হলে তা শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ পরিণতিসহ প্রকাশ পেয়ে যায়।
এটা লক্ষ্য করা আরও বেশি উদ্বেগজনক যে, মাওলানা সাদের বিষয়ে কিছু ‘বুজুর্গ’ আমাদের মহান সিনিয়র মুফতিদের ফতোয়ার বিরুদ্ধে রাখঢাক করে সমালোচনামূলক মন্তব্য করছেন।
মহান হানাফি ফকীহ, ইমাম কাজী খান (মৃত্যু ৫৯২ হিজরি), লিখেছেন:
رَجُلَانِ بَيْنَهُمَا خُصُوْمَةٌ فَجَاءَ أَحَدُهُمَا بِخُطُوْطِ الْفُقَهَاءِ وَالْفَتْوَى فَقَالَ الْخَصْمُ لَيْسَ كَمَا أَفْتَوْا أَوْ قَالَ لَا تُعْمَلُ بِهَذَا وَهُمَا مِنْ عَرْضِ النَّاسِ كَانَ عَلَيْهِ التَّعْزِيْرُ
(فتاوى قاضي خان ص۵۱٦ ج٣ قديمي كتب خانة)
অনুবাদ:
“যদি দুই ব্যক্তির মধ্যে বিরোধ থাকে, আর তাদের একজন ফুকাহাদের চিঠি ও ফতোয়া উপস্থাপন করে, তখন অপরজন বলে, “এভাবে তাঁরা ফতোয়া দেননি” অথবা “তাঁদের এই ফতোয়া অনুযায়ী কাজ কোরো না”, আর এই দুই ব্যক্তি যদি সম্মানিত লোক হন, তবে এমন ব্যক্তিকে তা’যীর (দৈহিক শাস্তি) প্রদান করা হবে”
(ফতোয়া কাজী খান, পৃষ্ঠা ৫১৬, খণ্ড ৩, কাদিমী কুতুব খানা সংস্করণ)
একইভাবে, আল ফাতাওয়া আল হিন্দিয়্যাহ-তে উল্লেখ করা হয়েছে:
رَجُلٌ عَرَضَ عَلَيْهِ خَصْمُهُ فَتْوَى الْأَئِمَّة ِفَرَدَّهَا وَقَالَ چہ بارنامہ فتوی آوردہ قِيْلَ يَكْفُرُ لِأَنَّهُ رَدَّ حُكْمَ الشَّرْعِ وَكَذَا لَوْ لَمْ يَقُلْ شَيْئًا لَكِنْ أَلْقَى الْفَتْوَى عَلَى الْأَرْضِ وَقَالَ این چہ شرع است كَفَرَ
(الفتاوى الهندية ص٣۷۲ ج۲ مكتبة رشيدية)
অনুবাদ:
“একজন ব্যক্তির প্রতিপক্ষ তার সামনে আলেমদের ফতোয়া উপস্থাপন করে, আর সে বলে, “এটা আবার কেমন ফতোয়া?”, তাহলে বলা হয় যে সে কুফরি করেছে, কারণ সে শরীয়তের নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করেছে। একইভাবে, যদি কেউ কিছু না বলে, বরং ফতোয়াটি মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে বলে, “এটা আবার কেমন শরীয়ত?” তাহলেও সে কুফরি করেছে”
(আল ফাতাওয়া আল হিন্দিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৩৭২, খণ্ড ২, মাকতাবা রশীদিয়্যাহ সংস্করণ)
দ্বীনের যেকোনো কাজ কেবল সম্প্রীতির মধ্য দিয়েই এগিয়ে যেতে পারে। দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ এই কাজের বরকত হ্রাস পাওয়ার দিকে নিয়ে যায়। এর ফলে সাধারণ মানুষ অস্বস্তিতে পড়বে এবং শেষপর্যন্ত কাজ থেকে দূরে সরে যাবে। বর্তমান বিষয়টি মোকাবেলায় কিছু বুজুর্গের দায়িত্বজ্ঞানহীন আবেগপ্রবণ মনোভাবই এটার জন্য দায়ী হবে। আল্লাহ তা’আলা আমাদের মাথাকে আমাদের হৃদয়ের ঊর্ধ্বে সৃষ্টি করেছেন। আবেগের ওপর যুক্তিরই প্রাধান্য পাওয়া উচিত।
প্রকৃতপক্ষে, তাবলীগের মেহনতের উদ্দেশ্য হলো মানুষকে তাদের আত্মিক ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলা এবং তাদের হৃদয়ে দ্বীনের একটি বিপ্লব সৃষ্টি করা। ফুকাহাগণ উল্লেখ করেছেন যে, দ্বীনের সঠিক জ্ঞান ও বোঝাপড়া ছাড়া মানুষকে দ্বীন শেখানো যায় না।
আল ফাতাওয়া আল হিন্দিয়্যাহ-তে লেখা আছে:
الْأَمْرُ بِالْمَعْرُوْفِ يَحْتَاجُ إِلَى خَمْسَةِ أَشْيَاءَ أَوَّلُهَا الْعِلْمُ لِأَنَّ الْجَاهِلَ لَا يَحْسُنُ الْأَمْرُ بِالْمَعْرُوْفِ
(الفتاوى الهندية ج5 ص353 مكتبة رشيدية)
অনুবাদ:
“সৎকাজের আদেশ দেওয়া ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করার জন্য পাঁচটি পূর্বশর্ত রয়েছে, তার মধ্যে প্রথমটি হলো [দ্বীনের সঠিক] জ্ঞান, কারণ একজন মূর্খ ব্যক্তি যথাযথভাবে সৎকাজের আদেশ দিতে ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করতে পারে না”
(আল ফাতাওয়া আল হিন্দিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৩৫৩, খণ্ড ৫, মাকতাবা রশীদিয়্যাহ সংস্করণ)
ফুকাহাদের রায়সমূহ স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, যখন একজন ব্যক্তি দ্বীনের জ্ঞানের ব্যাপারে অজ্ঞ থাকে বা অজ্ঞ হয়ে পড়ে, আর সে ইসলামবিরোধী মন্তব্য ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য দেয়, তখন সে আর তাবলীগের উদ্দেশ্য পূরণ করতে সক্ষম থাকে না।
ফুকাহাদের মনোভাবও নির্দেশ করে যে, যাদের ওপর মানুষকে পথ প্রদর্শনের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে, তাদের অবশ্যই মানুষকে এমন কোনো বিষয়বস্তু পড়া বা শোনা থেকে নিষেধ করা উচিত, যা তাদের দিকনির্দেশনাকে প্রভাবিত করতে পারে।
আল্লামা জহিরুদ্দিন আল বুখারী (মৃত্যু ৬১৯ হিজরি) মহান হানাফি ফকীহ ও তাত্ত্বিক আবুল ইউসর আহমদ ইবনে মুহাম্মদ আল বাযদাবী আল হানাফীর (মৃত্যু ৫৪২ হিজরি) উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন:
قَالَ الشَّيْخُ الْإِمَامُ صَدْرُ الْإِسْلَامِ أَبُو الْيُسْرِ:
نَظَرْتُ فِي الْكُتُبِ الَّذِيْ صَنَعَهَا الْمُتَقَدِّمُوْنَ فِيْ عِلْمِ التَّوْحِيْدِ فَوَجَدْتُ بَعْضَهَا لِلْفَلَاسِفَةِ مِثْلَ إِسْحَاقَ الْكِنْدِيْ وَالْإِسْفِزِارِيْ وَأَمْثَالِهِمَا وَذَلِكَ كُلُّهُ خَارِجٌ عَنِ الدَّيْنِ الْمُسْتَقِيْمِ زَائِغٌ عَنِ الطَّرِيْقِ الْقَوِيْمِ لَا يَجُوْزُ النَّظْرُ فِيْ تِلْكَ الْكُتُبِ وَلَا يَجُوْزُ إِمْسَاكُهَا فَإِنَّهَا مَشْحُوْنَةٌ مِّنَ الشِّرْكِ وَالضَّلَالِ” قَالَ “وَوَجَدْتُ أَيْضًا تَصَانِيْفَ كَثِيْرَةً
فِيْ هَذَا الْفَنِّ لِلْمُعْتَزِلَةِ مِثْلِ عَبْدِ الْجَبَّار الرَّازِيْ وَالْجُبَائِيْ وَالْكَعْبِيْ وَالنِّظَامِ وَغَيْرِهِمْ وَلَا يَجُوْزُ إِمْسَاكُ تِلْكَ الْكُتُبِ وَالنَّظْرُ كَيْلَا تَحْدُثُ الشُكُوْكُ وَلَا يَتَمَكَّنُ الْوَهْمُ مِنَ الْعَقَائِدِ”
(المسائل البدرية المنتخبة من الفتاوى الظهيرية للعيني ت٨۵۵ ص٤۷۲ ج۲ دار العاصمة)
অনুবাদ:
“শায়খ সদরুল ইসলাম আবুল ইউসর বলেছেন: “আমি পূর্ববর্তী প্রজন্ম তাওহীদ শাস্ত্রে যেসব গ্রন্থ রচনা করেছেন তা পর্যালোচনা করেছি, আর দেখেছি যে তার কিছু অংশ ইসহাক আল কিন্দী ও আল ইসফিজারীর মতো দার্শনিকদের রচনা, আর এসবই প্রকৃত দ্বীন থেকে দূরে এবং সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত।
এসব গ্রন্থ অধ্যয়ন করা বা সংরক্ষণ করা জায়েয নয়, কেননা এগুলো শিরক ও পথভ্রষ্টতায় পরিপূর্ণ।” এরপর তিনি বলেন, “আমি এই বিষয়ে মু’তাযিলাদের রচিত আরও বহু গ্রন্থও পেয়েছি, যেমন আব্দুল জব্বার আর-রাযী, আল জুবাঈ, আল কা’বী, নিযাম প্রমুখের রচনা। এসব গ্রন্থ সংরক্ষণ বা অধ্যয়ন করা জায়েয নয়, যাতে [সাধারণ মানুষের মধ্যে] সন্দেহ সৃষ্টি না হয় এবং তাদের বিশ্বাসে (আকীদায়) ভুল ঢুকে না পড়ে”
(আল মাসাইল আল বাদরিয়্যাহ আল মুনতাখাবা মিনাল ফাতাওয়া আল যাহিরিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৪৭২, খণ্ড ২, দারুল আসিমাহ)
এই ফতোয়া বর্ণনা করার পর, মহান হানাফি ফকীহ আল্লামা উমর ইবনে মুহাম্মদ আস-সানামী (মৃত্যু ৮০০ হিজরি) এমনকি এ কথাও বলেন:
قَالَ الْعَبْدُ وَلَمَّا اطَّلَعْتُ عَلَى هَذِهِ الرِّوَايَةِ بِأَنَّ كُتُبَ الْمُعْتَزِلَةِ الْمُشْتَمِلَةِ عَلَى اعْتِقَادِهِمْ وَبَيَانِ مَذْهَبِهِمِ الْخَبِيْثِ لَا يَجُوْزُ إِمْسَاكُهَا وَكَانَ عِنْدِيْ الْكَشَّافُ لِلزَّمَخْشَرِيِّ وَفِيْهِ مَذْهَبُ الْإِعْتِزَالِ فِيْ كُلِّ صَحْفَةٍ وَوَرِقَةٍ فَأَخْرَجْتُهُ مِنْ بَيْتِيْ وَمَا بِعْتُهُ بِثَمَنٍ مَخَافَةَ أَن يُّحْرَمَ ثَمَنُهُ كَحُرْمَةِ ثَمَنِ الْخَمَرِ وَالْمَيْتَةِ وَالْخِنْزِيْرِ
(نصاب الإحتساب للسنامي ت في القرن الثامن ص259-260 مكتبة الطالب الجامعي)
অনুবাদ:
“এই বান্দা বলছে, যখন আমি [আবুল ইউসর আহমদ ইবনে মুহাম্মদ আল বাযদাবী আল হানাফীর (মৃত্যু ৫৪২ হিজরি)] এই ফতোয়ার সন্ধান পেলাম যে, মু’তাযিলাদের বইগুলো, যেগুলোতে তাদের কলুষিত বিশ্বাস রয়েছে, সেগুলো রাখা জায়েয নয়, তখন আমি [বুঝতে পারলাম যে] আমার কাছে যামাখশারীর ‘আল কাশশাফ’ বইটি ছিল, যাতে প্রতিটি পৃষ্ঠা ও প্রতিটি অধ্যায়ে মু’তাযিলা মতবাদের বিবরণ ছিল, তাই আমি তা আমার ঘর থেকে বের করে দিলাম, আর টাকার বিনিময়ে তা বিক্রিও করলাম না,
এই আশঙ্কায় যে সেই টাকা হারাম হয়ে যাবে, যেমনভাবে মদ, মৃত প্রাণী ও শূকরের বিক্রয়লব্ধ অর্থও হারাম বিবেচিত হয়”
(নিসাবুল ইহতিসাব, পৃষ্ঠা ২৫৯-২৬০, মাকতাবা আত-তালিব আল জামিঈ)
বস্তুত, ফুকাহাগণ উল্লেখ করেছেন যে, সম্মানিত আলেমদের এমন ব্যক্তিদের কাছে যাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত যারা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে, এমনকি তাদের সরল পথে ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে হলেও। এটি এই জন্য, যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ভুল ধারণা তৈরি না হয় যে, সম্মানিত আলেমরা এমন ব্যক্তির বিশ্বাসকে সমর্থন করছেন।
আল্লামা তাহির আল বুখারী (মৃত্যু ৬০০ হিজরির পরে) লিখেছেন:
وَفِي النَّوَازِلِ سُئِلَ نَصِيْرُ عَنْ رَجُلٍ يَخْتَلِفُ إِلَى رَجُلٍ مِّنْ أَهْلِ الْبَاطِلِ وَالشَّرِّ لِيَذُبَّ عَنْ نَفْسِهِ إِنْ كَانَ هَذَا الرَّجُلُ مَشْهُوْرًا مِّمَّن يُّقْتَدَى بِهِ فَإِنَّهُ يُكْرَهُ أَن يَخْتَلِفَ إِلَيْهِ
(خلاصة الفتاوى لطاهر البخاري ت بعد ٦۰۰ه ص٣٣۵ ج٤ مكتبة رشيدية)
অনুবাদ:
“আন-নাওয়াজিলে উল্লেখ আছে, নাসিরকে [ইবনে ইয়াহইয়া; বলখের একজন মহান হানাফি ফকীহ] এমন একজন ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, যিনি এমন একজনের কাছে যাতায়াত করেন যিনি মন্দ ও কলুষিত বিশ্বাসের অধিকারী, যাতে তাকে বিরত রাখা যায়; যদি এই [সাক্ষাৎকারী] ব্যক্তি সুপরিচিত এবং [আলেমদের] মধ্যে অনুসরণীয় হন, তাহলে তার জন্য এমন ব্যক্তির কাছে যাতায়াত করা অপছন্দনীয়”
(খুলাসাতুল ফাতাওয়া, পৃষ্ঠা ৩৩৫, খণ্ড ৪, মাকতাবা রশীদিয়্যাহ)
মারওয়ান ইবনে আল-হাকামের খিলাফতকালে, সাহাবা ও তাবিঈনগণ তাঁর বক্তৃতায় বসা এড়িয়ে চলতেন, যখন তিনি তাঁর বক্তৃতায় ইসলামবিরোধী সুর প্রকাশ করতে শুরু করতেন।
মাওলানা সাদের বিরুদ্ধে দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়ায় যেসব মন্তব্য করা হয়েছে, আমরা তা লক্ষ্য করেছি। আমরা অন্যান্য মিডিয়া চ্যানেলের মাধ্যমে মাওলানা সাদের বহু রেকর্ডিংও শুনেছি। আমাদের বিনীত অভিমত হলো যে, দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া মাওলানা সাদকে ছাড় দেওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট উদার হয়েছে। তাঁর আরও অনেক গুরুতর বক্তব্য রয়েছে, যা তাঁর আকীদা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করে। একটি উদাহরণ দিতে গেলে: তিনি বলেন যে, হিদায়াত আল্লাহর হাতে নেই।
এটা স্পষ্টতই দলিলভিত্তিক গ্রন্থসমূহের বিপরীত এবং এতে একজন মানুষের ঈমান নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
আল্লাহ তা’আলা বলেন:
إِنَّكَ لَا تَهْدِيْ مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللهَ يَهْدِيْ مَن يَّشَاءُ
(سورة القصص آية ۵٦)
অনুবাদ:
“নিশ্চয়ই তুমি যাকে চাও তাকে হিদায়াত দিতে পার না, বরং আল্লাহ যাকে চান তাকেই হিদায়াত দেন” (সূরা কাসাস, আয়াত ৫৬)
মাওলানা সাদ আরও বলেন যে, হারামাইনের পরে নিজামুদ্দিন মার্কাজের স্থান দ্বিতীয়। এটা নিঃসন্দেহে গুরুতর ও স্পষ্ট চরমপন্থা। হাদীসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, হারামাইনের পরে মসজিদ আল আকসার স্থান তৃতীয়।
এমন মন্তব্যের জন্য দোষী ব্যক্তির জন্য মানুষের অনুসরণীয় ব্যক্তির (মুক্তাদা) আসনে থাকা বৈধ নয়। এমন ব্যক্তিকে প্রচার করা কিংবা জনসাধারণকে তার দিকে পরিচালিত করাও বৈধ নয়।
আমাদের সরলমনা আন্তরিক জনসাধারণকে এমন কলুষিত ব্যাখ্যার সামনে ফেলার পরিণতি একবার কল্পনা করুন।
ভারতের এত অধিকসংখ্যক সিনিয়র মুফতির প্রতি শ্রদ্ধার ক্ষেত্রেও এটি একটি অভিযোগ যে, নিজামুদ্দিনের মতভেদকে একটি গুজরাটি ও ইউপি’র সমস্যা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। ফতোয়া স্পষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে জারি করা হয়, আর এই ক্ষেত্রে তা স্পষ্টভাবেই বিদ্যমান।
এমন পরিস্থিতিতে ইমাম আবু হানীফার নিম্নলিখিত স্পষ্ট রায়টি বিবেচনা করুন।
আল্লামা ইবনে নুজাইম মহান ইমাম আবু হানীফা কর্তৃক তাঁর কৃতী ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফকে প্রদত্ত অসিয়ত লিপিবদ্ধ করেছেন। তাঁর ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফের প্রতি সেই অসিয়তে মহান ইমাম আবু হানীফা বলেছিলেন:
وَإِذَا عَرَفْتَ إِنْسَانًا بِالشَّرِّ فَلَا تَذْكُرْهُ بِهِ بَلِ اطْلُبْ مِنْهُ خَيْرًا فَاذْكُرْهُ بِهِ إِلَّا فِيْ بَابِ الدِّيْنِ فَإِنَّكَ إِنْ عَرَفْتَ فِيْ دِيْنِهِ كَذَلِكَ فَاذْكُرْهُ لِلنَّاسِ كَيْلَا يَتَّبِعُوْهُ وَيَحْذُرُوْهُ
(الأشباه والنظائر لإبن نجيم ت970ه ص712 ج2 إدارة القرآن)
অনুবাদ:
“যখন তুমি কোনো ব্যক্তিকে অন্যায়কারী বলে চিনতে পার, তখন [মানুষের কাছে] তা উল্লেখ কোরো না, বরং তার ভালো দিক খুঁজে বের করে তা উল্লেখ কোরো, দ্বীনের বিষয় ব্যতীত। কেননা যদি তুমি কাউকে তার দ্বীনের ব্যাপারে অন্যায়কারী বলে চিনতে পার (অর্থাৎ তার আকীদা কলুষিত), তাহলে তাকে মানুষের কাছে উল্লেখ কোরো, যাতে তারা তাকে অনুসরণ না করে এবং তার ব্যাপারে সচেতন থাকে”
(আল আশবাহ ওয়ান নাযাইর, পৃষ্ঠা ৭১২, খণ্ড ২, ইদারাতুল কুরআন সংস্করণ)
উপরোক্ত উদ্ধৃতিগুলোর আলোকে, মানুষকে নিজামুদ্দিনের দিকে পরিচালিত করা বৈধ নয়। এতে তারা বিভ্রান্ত হবে এবং দাওয়াহ ও তাবলীগের সেই মহান উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যাবে, যা হলো মানুষকে তাদের আত্মিক ঘুম থেকে জাগিয়ে আল্লাহ তা’আলার আনুগত্যের দিকে নিয়ে আসা।
আমাদের স্থানীয় মসজিদগুলোতেও নিজামুদ্দিন ও রাইওয়াইন্ড মতভেদের ভয়াবহ পরিণতি থেকে নিজেদের রক্ষা করা উচিত।
আমাদের এটাও মনে রাখা উচিত যে, অনেক বিভ্রান্ত দল এমন মতভেদের সুযোগ নিয়ে সমৃদ্ধ হয়, আর তা কাজে লাগিয়ে নিজেদের উদ্দেশ্য এগিয়ে নেয়।
বিভিন্ন মিডিয়া চ্যানেলের নিবিড় ও সতর্ক দৃষ্টিকেও কখনো উপেক্ষা বা খাটো করে দেখা উচিত নয়। মাওলানা সাদের বিষয়ে মিডিয়ার ভূমিকা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। মিডিয়ার প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করা একটি বিশাল কাজ, প্রায় একটি হেরে যাওয়া লড়াইয়ের মতো।
আমাদের সম্মানিত ভারতীয় মুফতিগণ জনসাধারণকে তাঁর ভুল বিশ্বাস দ্বারা বিভ্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করার স্বার্থে, মাওলানা সাদের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করার আগে যথেষ্ট সতর্কতা ও সংযম অবলম্বন করেছেন।
এমনটা যেন না ঘটে যে, আমাদের স্থানীয় মুফতিগণ এবং বিশ্বজুড়ে অন্যান্য স্থানীয় মুফতিগণও একদিন বাধ্য হয়ে তাঁদের নিজ নিজ এলাকার এমন মানুষদের বিরুদ্ধে নাম ধরে ফতোয়া জারি করতে হয়, যারা তাদের জনসাধারণকে মাওলানা সাদের বর্তমান বিভ্রান্তি এবং নিজামুদ্দিনের বর্তমান পরিস্থিতির দিকে পথভ্রষ্ট করছে।
আর আল্লাহ তা’আলাই সর্বজ্ঞ
মুফতি ইব্রাহিম দেসাই
দক্ষিণ আফ্রিকার অনেক মুফতির পক্ষ থেকেও অনুরূপ ফতোয়ার কথা আমরা নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানতে পেরেছি।
পরবর্তী: তাবলীগ জামাতের সম্পূর্ণ ইতিহাস পড়ুন: উৎপত্তি, সম্প্রসারণ ও সংরক্ষণ

