২০১৬ সালের ১৩ ডিসেম্বর ফজরের বয়ানে মাওলানা সাদ বলেন (উর্দুতে):

অনুবাদ:
দাওয়াত পরিত্যাগ করা নিঃসন্দেহে উম্মাহর বিপথগামী হওয়ার একটি কারণ। উলামাগণ লিখেছেন যে, আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করা ত্যাগ করা গোমরাহীর একটি কারণ। মুফাসসিরগণ এমনকি লিখেছেন যে, মূসা (আঃ) তাঁর সম্প্রদায়কে পেছনে রেখে একাকী আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এবং ইবাদতে মগ্ন থেকে তাঁকে খুশি করার জন্য চলে গিয়েছিলেন। আল্লাহ তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন:
“হে মূসা! কিসে তোমাকে ত্বরা করালো?” (সূরা ত্বা-হা: ৮৩)। মূসা (আঃ) উত্তর দিলেন, “তারা পেছনে রয়ে গেছে, আর আমি তোমাকে সন্তুষ্ট করার জন্য ত্বরা করে এগিয়ে এসেছি।”
_মনোযোগ সহকারে শুনুন! আল্লাহ মূসা (আঃ)-কে বললেন: “হে মূসা (আলাইহিস সালাম)! তোমার পশ্চাতে তোমার সম্প্রদায়কে আমি বিপদ ও পরীক্ষার মধ্যে ফেলেছি।” উলামাগণ লিখেছেন যে, এর কারণ ছিল, মূসা (আঃ) তাঁর সম্প্রদায়কে সঙ্গে না নিয়ে পেছনে রেখে গিয়েছিলেন। মূসা (আঃ) চল্লিশ রাত ইবাদতে অতিবাহিত করেছিলেন।
এটি আল্লাহর মহিমা যে, বনী ইসরাঈলের ৬,০০,০০০ মানুষের মধ্যে, যারা সকলেই হিদায়াতের উপর ছিল, তাদের মধ্য থেকে মাত্র চল্লিশ রাতের স্বল্প সময়ের মধ্যে ৫,৮৮,০০০ জন বিপথগামী হয়ে গিয়েছিল। মূসা (আঃ) মাত্র চল্লিশ রাতের জন্যই দাওয়াতের কাজ ছেড়েছিলেন। আমি বুঝেশুনে বলছি যে, যেহেতু মূসা (আঃ) মাত্র চল্লিশ রাতের জন্য দাওয়াত ছেড়ে ইবাদতে মগ্ন ছিলেন, এই সময়ের মধ্যে বনী ইসরাঈলের ৫,৮৮,০০০ মানুষ সকলেই বাছুরের পূজা শুরু করে দিয়েছিল।_
এই বিপজ্জনক বক্তব্যটি মূসা (আঃ)-এর মতো একজন মহান নবীর প্রতি সরাসরি সমালোচনা। মাওলানা সাদের ব্যাখ্যা থেকে মনে হয় যে, মূসা (আঃ) নিজের ইচ্ছায় দাওয়াতের প্রচেষ্টা ছেড়ে দিয়েছিলেন; নির্জনে আল্লাহ তা'আলার ইবাদতের প্রতি নিজের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য। তিনি বনী ইসরাঈলের শিরকে জড়িয়ে পড়ার জন্য মূসা (আঃ)-কে দোষারোপ করেছেন।
তবে, উলামাগণ উল্লেখ করেছেন যে, স্বয়ং পবিত্র কুরআনেই আল্লাহ তা'আলা মূসা (আঃ)-কে তূর পর্বতে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং তাঁকে তাঁর উম্মত, বনী ইসরাঈলের কিছু লোককে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁকে তূর পর্বতে চল্লিশ রাত অতিবাহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। মূসা (আঃ) আল্লাহর নির্দেশ পালনের জন্য কয়েকজন ব্যক্তিসহ যাত্রা করলেন এবং যাওয়ার সময় হারুন (আঃ)-কে নির্দেশ দিয়ে বললেন:
তুমি আমার অনুপস্থিতিতে আমার প্রতিনিধি ও স্থলাভিষিক্ত থাকবে। সমস্ত বিষয়াদি সুশৃঙ্খল রাখবে এবং যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তাদের অনুসরণ করবে না (সূরা আল আরাফ ৭:১৪২)
মাওলানা সাদ কর্তৃক প্রদত্ত ব্যাখ্যা হলো, মূসা (আঃ) তাঁর সম্প্রদায়কে সঙ্গে না নিয়ে পেছনে রেখে গিয়েছিলেন। এরপর, তিনি ইবাদতে মগ্ন থেকে চল্লিশ রাতের জন্য দাওয়াতের কাজ ছেড়ে দিয়েছিলেন। ফলস্বরূপ, বনী ইসরাঈলের ৫,৮৮,০০০ মানুষ শিরকে জড়িয়ে পড়ে এবং বাছুরের পূজা শুরু করে দেয়।
মুফতি আব্দুল মালেক, বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত আলেম উল্লেখ করেন:
আসুন একটু চিন্তা করি! মাওলানা সাদের এই বক্তব্য কি শুধুমাত্র মূসা (আঃ)-এর প্রতি আপত্তি, নাকি এটি আল্লাহ কর্তৃক মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে প্রদত্ত নির্দেশের প্রতিও আপত্তি? এটি আল্লাহর নির্দেশের প্রতিও আপত্তি! এটিকে সাধারণ ভুল হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। বরং, এটি একটি গুরুতর ও মারাত্মক ভুল। এই বক্তব্যটি একজন নবীর মর্যাদার প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করে এবং তাঁর মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে। এই বক্তব্যটি নিছক অসতর্কতাবশত দেওয়া হোক বা না হোক, ফলাফল একই। এটি আল্লাহর নির্দেশের প্রতি আপত্তি। তিনি বলেছেন যে, বনী ইসরাঈলের ৫,৮৮,০০০ মানুষের বিপথগামী হওয়ার একমাত্র কারণ ছিল, মূসা (আলাইহিস সালাম) দাওয়াতের কাজ ছেড়ে দিয়েছিলেন! নাউযুবিল্লাহ, আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।
আল্লাহ তা'আলা মূসা (আঃ)-কে চল্লিশ রাতের জন্য তূর পর্বতে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে গিয়েছিলেন। তবে, মাওলানা সাদ সাহেব বলছেন যে, এভাবে যাওয়ার মাধ্যমে তিনি দাওয়াতের প্রচেষ্টা ছেড়ে দিয়েছিলেন। বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে বোঝার জন্য আমি একটি উদাহরণ দিই। ফরজ সালাতের সময় হলে কি কেউ দাওয়াত দেয়? ফরজ সালাত ছেড়ে দাওয়াতের প্রচেষ্টা করা কি একজন ব্যক্তির জন্য অনুমোদিত? না, কারণ সেই নির্দিষ্ট মুহূর্তে আল্লাহর নির্দেশ হলো সালাত আদায় করা। তাহলে কীভাবে বলা যায় যে, আল্লাহর নির্দেশে তূর পর্বতে গিয়ে মূসা (আঃ) দাওয়াতের প্রচেষ্টা ছেড়ে দিয়েছিলেন? দাওয়াত এবং দাওয়াত সংক্রান্ত কার্যক্রম ফরজ সালাতের সময়ের বাইরে সংঘটিত হয়। জওলা করা হয় আসরের পর এবং বয়ান হয় মাগরিবের পর। ঠিক একইভাবে, আল্লাহর অবশ্যপালনীয় নির্দেশের কারণে মূসা (আঃ) তূর পর্বতে গিয়েছিলেন। তবে, মনে হচ্ছে মাওলানা সাদ সাহেব মনে করেন যে, দাওয়াতের প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে, এমনকি তার জন্য যদি একটি অবশ্যপালনীয় নির্দেশও ছাড়তে হয়। এটি অনেকটা এমন বলার মতো যে, যোহরের নামাজ ছেড়ে দিয়ে হলেও একজন ব্যক্তির দাওয়াত দেওয়া উচিত। আপনার নামাজ পড়তে ১০-১২ মিনিট সময় লাগবে, অথচ যদি আপনি সেই সময় দাওয়াত দেন, তাহলে সম্ভবত একজন ব্যক্তি সালাতের গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে পারবে।
মাওলানা সাদ সাহেব ইঙ্গিত করছেন যে, মূসা (আঃ) দাওয়াতের কাজ ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং এর ফলে বনী ইসরাঈল বিপথগামী হয়ে যায়। তিনি আল্লাহর একজন নবীকে দোষারোপ করছেন। অন্যদিকে, আল্লাহ কুরআনে বলছেন যে, এটি ছিল তাঁর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা এবং তাদের বিপথগামী হওয়ার প্রকাশ্য কারণ ছিল সামিরী নামক ব্যক্তি।

